একজন লড়াকু ক্রিকেটারের কথা/দুলাল মাহমুদ


ক্রিকেটার হিসেবে তখন তিনি দেদীপ্যমান। ডানহাতি ষ্ট্যাইলিশ ব্যাটসম্যান। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ও উইকেটকিপার হিসেবেই তাঁর খ্যাতি ও প্রতিপত্তি। আক্রমণাত্মক মেজাজের ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর পরিচয়। তাঁর ঝলমলে ষ্ট্রোক প্লেতে হেসে ওঠে গ্যালারি। তাঁর সুইপ শটে ছড়িয়ে পড়ে মুগ্ধতার আবেশ। প্রাদেশিক ক্রিকেট দলের অন্যতম নির্ভরতা তিনি। শক্তিশালী পাকিস্তানি জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্যাম্পেও ডাক পেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন টেষ্ট ক্রিকেট খেলা। সংগত কারণেই তাঁর ব্যাটের দিকে তাকিয়ে থাকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান। তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে ক্রিকেটের উজ্জ্বল রঙিন দিন। এমন একটি আলোকিত ও সম্ভাবনাময় জীবনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন তিনি। ভালোবাসার ক্রিকেটকে পরিত্যাগ করে বেছে দিলেন কঠিন ও রক্তিম এক পথ। দেশ মাতৃকার জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও কার্পণ্য করেননি। ক্রিকেটের চেয়ে তাঁর বেশি ভালোবাসা এ দেশের মা-মাটি-মানুষকে। সাড়া দিলেন তাঁরই ডাকে। তিনি আবদুল হালিম চৌধুরী। জুয়েল নামেই সমধিক পরিচিত।
১৯৫০ সালের ১৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দক্ষিণ পাইকশা গ্রামে জুয়েলের জন্ম। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা ঢাকার টিকাটুলিতে। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ক্রিকেট পাগল। যেখানে ক্রিকেট, সেখানে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। বাসার কাছে ঢাকা স্টেডিয়ামে সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন। কোনো ক্রিকেট খেলাই মিস করতেন না। দেশি-বিদেশি খেলা যেমন দেখতেন, তেমনি নিজেও খেলতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে একটা টানাপড়েন ছিল, সেটাকে তাঁর পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। তারপরও ক্রিকেটই ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। ক্রিকেটেই সঁপে দিয়েছিলেন মন-প্রাণ। ক্রিকেটের জন্য তিনি যে কোনো ত্যাগ শিকারে প্রস্তুত ছিলেন। নেট প্র্যাকটিসে তিনি সবার আগে আসতেন। সবার শেষে যেতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। হুক, পুল, স্কোয়ার কাট আর অফড্রাইভে তিন ছিলেন তুখোড়। ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রধান দুই দল প্রথমে আজাদ বয়েজ ক্লাব এবং পরে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ছড়িয়েছেন তাঁর ব্যাটের দীপ্তি। উইকেটকিপার হিসেবেও আলাদা অবস্থান গড়ে নেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মোহামেডানে যোগ দেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ ক্লাব। প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে খেলেছেন দাপটের সঙ্গে। ১৯৭০-৭১ মৌসুমে ক্রিকেট লিগে তিনি দুর্দান্ত খেলেন। প্রায় প্রতি ম্যাচেই বড় স্কোর গড়েন। কারদার সামার ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করেন। কিন্তু তারপরও তাঁর মূল্যায়নটা যথাযথভাবে করা হয়নি। তবে পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন তিনি। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান দলেও ছিল অবাঙালিদের প্রাধান্য। তারমধ্যে যে ক’জন বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান দলে স্থান করে নেন, তিনি তাঁদের একজন। তিনি ঢাকা, ইষ্ট পাকিস্তান ও ইষ্ট পাকিস্তান হোয়াইটের হয়ে প্রথম শ্রেণীর সাতটি ম্যাচ খেলেন। প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছেন পাকিস্তানি টেষ্ট ক্রিকেটারদের। সে সময় ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে রানের ফোয়ারা খুব একটা ছুটতো না। কালেভদ্রে বড় ইনিংস দেখা যেত। একজন ব্যাটসম্যান ম্যাচে ৩০/৪০ রান করলেই চোখে পড়ে যেতেন। সে হিসেবে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান দলের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান। তবে যখন তাঁর পরিপূর্ণভাবে নিজেকে মেলে ধরার কথা, তখনই তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে।  
১৯৬৬ সালের ২১ মে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে জুয়েলের অভিষেক হয়। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আইয়ুব ট্রফিতে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের বিপক্ষে ঢাকার হয়ে তিন দিনের ম্যাচ খেলেন। প্রথম ইনিংসে ৩৮ ও দ্বিতীয় ইনিংসে চার রান করেন। তাঁর ৩৮ ছিল দুই দলের মধ্যে সর্বাধিক রানের ইনিংস। ম্যাচটি ড্র হয়। ঢাকার খেলোয়াড়রা হলেন-শামীম কবীর, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, বজল-উর-রহমান, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), সেলীম আহমেদ, শফিকুল হক হীরা, মেহদি হুদা, এ কে আমিরুল্লাহ, মিসবাহউদ্দিন আহমেদ, নাজাম-উল-হাসান ও সিরাজ আহমেদ। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর হায়দরাবাদের নিয়াজ ষ্টেডিয়ামে কায়দ-ই-আজম ট্রফিতে হায়দরাবাদ, খায়েরপুর ও কোয়েটার  বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে তিনি ইষ্ট পাকিস্তান দলের হয়ে খেলেন। প্রথম ইনিংসে ৪ করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ রান করেন। এ ম্যাচে ইষ্ট পাকিস্তান ৫ উইকেটে জয়ী হয়। ইষ্ট পাকিস্তান দলে খেলেন-রেহমান আলী, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, নাসিম-উল-গণি, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), রউফ আনসারি, আনওয়ার আহমেদ, মোহাম্মদ সাদিক, নওশাদ আলী, মাসুদ-উল-হাসান, এ কে আমিরুল্লাহ ও মুফাসসির-উল-হক। ১৯৬৯ সালের ২২ আগষ্ট করাচির ন্যাশনাল ষ্টেডিয়ামে খেলেন করাচি হোয়াইট-এর বিপক্ষে। কায়দ-ই-আজম ট্রফির তিন দিনের ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৫ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২৭ রান করেন। ম্যাচটি ড্র হয়। ইষ্ট পাকিস্তান দলে খেলেন-এ এস এম রকিবুল হাসান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), ইফতিখার জায়িদি, মোহাম্মদ সাদিক, শফিকুল হক হীরা, মেহদি হুদা, সৈয়দ আশরাফুল হক, ফারুক আহমেদ, দৌলত-উজ-জামান ও রফি উমর। একই টুর্নামেন্টে ১৯৬৯ সালের ২৯ আগষ্ট করাচির ন্যাশনাল ষ্টেডিয়ামে খায়েরপুরের বিপক্ষে খেলেন। তিন দিনের ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ১৫ রান করেন। ইষ্ট পাকিস্তান এ ম্যাচে ইনিংস ও ৫ রানে জয়ী হয়। ইষ্ট পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়রা হলেন- এ এস এম রকিবুল হাসান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, মোহাম্মদ সাদিক, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), শফিকুল হক হীরা, সৈয়দ আশরাফুল হক, মেহদি হুদা, ফারুক আহমেদ, দৌলত-উজ-জামান, এনায়েত হোসেন সিরাজ ও হাসনাইন ইস্পাহানি। ১৯৬৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর কায়দ-ই-আজম ট্রফিতে করাচির ন্যাশনাল ষ্টেডিয়ামে হায়দরাবাদ হোয়াইট-এর বিপক্ষে তিনি খেলেন। তিন দিনের ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ১২ ও  দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ রান করে। ইষ্ট পাকিস্তান এ ম্যাচে ১৩৫ রানে জয়ী হয়। ইষ্ট পাকিস্তান দল : এ এস এম রকিবুল হাসান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, মোহাম্মদ সাদিক, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), শফিকুল হক হীরা, সৈয়দ আশরাফুল হক, ইফতিখার জায়িদি, ফারুক আহমেদ, তানভীর মাজহার তান্না, দৌলত-উজ-জামান ও হাসনাইন ইস্পাহানি। ১৯৭১ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকা ষ্টেডিয়ামে বিসিসিপি ট্রফির তিন দিনের ম্যাচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে ইষ্ট পাকিস্তান হোয়াইট-এর হয়ে খেলেন। প্রথম ইনিংস ৪৭ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৫ রান করেন। এটি ছিল তাঁর সেরা পারফরম্যান্স। ম্যাচটি ড্র হয়। এ দলের খেলোয়াড়রা হলেন-আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, রউফ আনসারি, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), তাহির হাসান, মোহাম্মদ সাদিক, সেলীম আহমেদ, দৌলত জামান, ফারুক আহমেদ, শফিকুল হক হীরা, তানভীর হায়দার ও সালাউদ্দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলেন-এ এস এম রকিবুল হাসান, আলিউল ইসলাম, ফারুক মির্জা, সৈয়দ আশরাফুল হক (অধিনায়ক), আলী জাহিদ, জহির আহমেদ, ফখর-উল-হাসান, তানভীর মাজহার তান্না, মাইন-উল-হক, এনায়েত হোসেন ও হাসনাইন ইস্পাহানি। ২৬ জানুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে একই টুর্নামেন্টে তিনি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের বিপক্ষে খেলেন। প্রথম ইনিংসে ৪ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ০ রানে অপরাজিত থাকেন। তিন দিনের ম্যাচটি ড্র হয়। ইষ্ট পাকিস্তান হোয়াইটের খেলোয়াড়রা হলেন- আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, রউফ আনসারি, তাহির হাসান, দৌলত জামান, এম এ লতিফ (অধিনায়ক), মোহাম্মদ সাদিক, শফিকুল হক হীরা, সেলীম আহমেদ, ফারুক আহমেদ, তানভীর হায়দার ও সালাউদ্দিন। সাতটি ম্যাচ খেলে তিনি ২১ দশমিক ৫৮ গড়ে ২৫৯ রান করেন। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ক্রিকেটারদের পক্ষে এই রান ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর ওপেনিং পার্টনার ছিলেন শামীম কবীর, সৈয়দ রেহমান আলী, এ এস এম রকিবুল হাসান, শফিকুল হক হীরা ও রউফ আনসারি।
জুয়েল জাতীয় অনূর্ধ-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন। ১৯৭০ সালের ২৫ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা ষ্টেডিয়ামে ইষ্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের হয়ে ঢাকা এডুকেশন বোর্ডের বিপক্ষে খেলেন। তিন দিনের ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৫ রান করেন। ম্যাচটি ড্র হয়। ইষ্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনে খেলেন-এ এস এম রকিবুল হাসান (অধিনায়ক), আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, রউফ আনসারি, জাহিদ, সৈয়দ আশরাফুল হক, এরাজ, হাসনাইন ইস্পাহানি, মাইনূল, তানভীর মাজহার তান্না, আশফাক ও তানভীর হায়দার। এ ম্যাচে অল-রাউন্ড নৈপুণ্য দেখান তানভীর মাজহার তান্না। ব্যাট হাতে ১০৭ রান করেন এবং দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে ৫৩ রানে ৮ উইকেট নেন। ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা ষ্টেডিয়ামে তিনি লাহোর দলের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচ খেলেন। তিন দিনের ফাইনালে প্রথম ম্যাচে ২৩ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ রান করেন। ম্যাচটি ড্র হয়। পূর্ব পাকিস্তান দলে খেলেন- এ এস এম রকিবুল হাসান (অধিনায়ক), আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল, রউফ আনসারি, মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ আশরাফুল হক, এরাজ, মাইনুল, আশফাক, তানভীর মাজহার তান্না, হাসনাইন ইস্পাহানি ও তানভীর হায়দার।
লাহোর দলে ইমরান খান, ওয়াসিম রাজার মতো ক্রিকেটাররা খেলেন।
১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সফরে আসে নিউজিল্যান্ড জাতীয় ক্রিকেট দল। এ সফরে কিউইরা তিনটি টেষ্ট খেলে। এ সিরিজে খেলার জন্য জুয়েল পাকিস্তান ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু মূল দলে তিনি সুযোগ পাননি।
বড় ছেলে হওয়ায় জুয়েলকে নিয়ে পরিবারের অনেক প্রত্যাশা ছিল। পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্বের কথাও তিনি বিস্মৃত হননি। পড়ালেখা শেষ করার আগেই তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। চাকরি করলেও ক্রিকেট খেলাটা ছিল তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।   
ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে তাঁকে ঘুরতে হয়। সে সময়ই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য রাজনৈতিক সচেতন জুয়েলের হৃদয়ে দারুণভাবে দাগ কাটে। একটু একটু করে বুকের মধ্যে যে রাজনৈতিক বোধ সঞ্চার হতে থাকে, এক সময় তার বিস্ফোরণ ঘটে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ বলিদান করেন নিজের প্রাণ।   
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিহত হন আজাদ বয়েজ ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক মুশতাক। ২৭ মার্চ ঢাকা জেলা ক্রীড়া পরিষদের সামনে দুই দিন ধরে তাঁর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে বুকের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে একসময়ের আজাদ বয়েজের ক্রিকেটার জুয়েলের বুকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য মে মাসের শেষ দিকে তিনি ভারতে যান। ভারতের আগরতলার কাছে ‘মেলাঘর ক্যাম্প’-এ মুক্তি যোদ্ধাদের কমান্ডো বাহিনী ‘ক্র্যাক প্ল্যাটুন’-এর হয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এটি ছিল মুক্তিবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল। তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আত্মঘাতি এই স্কোয়াড গঠিত হয়। এর দায়িত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দার। এই কমান্ডো দলের সাহসী বীরদের অন্যতম হলেন জুয়েল, রুমী, আজাদ, বদিউল আলম, চুল্লু, কাজী কামাল, হাবিবুল আলম, মায়া, স্বপন, দস্তগীর গাজী, বদিউজ্জামান, জিয়াউদ্দিন, বাচ্চু, আসাদ, সামাদ, আলভী, আজম খান, উলফাত, বাদল, ফতেহ চৌধুরী, পুলু, মতিন, হ্যারিস, রোজারিও প্রমুখ। প্রশিক্ষণ শেষে জুয়েল ঢাকায় এসে গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন। ক্রিকেটার হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন সাহসী, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অপরিসীম দু:সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে বিভিন্ন অপারেশনে তিনি বীরত্বের পরিচয় দেন। অনেক সফল ও সার্থক অপারেশনের নায়ক ছিলেন এই গেরিলা যোদ্ধা। ঢাকা শহরে প্রকাশ্য দিবালোকে জীবনের পরোয়া না করে তিনি যেভাবে অপারেশনে অংশ নিয়ে শত্রুদের ঘায়েল করেন, তা হলিউডের ফিল্মকেও হার মানিয়েছে। এইসব অভিযানে তাঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন দু:সাহসী।একের পর এক তাঁদের দুর্ধর্ষ ও সফল অপারেশনে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। কিন্তু আগষ্টে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার ষ্টেশনে গেরিলা অপারেশনের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তিনি আহত হন। বিশেষ করে ডান হাতের আঙুলগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়। তাঁর স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হলে তিনি আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরে যাবেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্খা কখনো পরিত্যাগ করেননি। এ কারণে হাতে আঘাত পাওয়ার পর বোনদের বলতেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে আমি আবার ক্রিকেট খেলতে পারবো তো?’ কিন্তু ২৯ আগষ্ট ঢাকার বড় মগবাজার এলাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। যতটা জানা যায়, ৩১ আগষ্ট তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সফল ক্রিকেটার হয়েও দেশের মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন তিনি। তিনি এটা ভালোভাবেই জানতেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মানে জীবনকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দেওয়া। সেটা বুঝতে পেরে ভারতে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার আগে জুয়েল তাঁর একটি বাঁধাই করা ছবি মা ফিরোজা বেগমকে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যখন থাকবো না, তখন এই ছবিটাতে তুমি আমাকে দেখতে পাবে’। তাঁর এ কথাটি সত্যি হয়ে যায়। তিনি জানতেন, দেশ একদিন স্বাধীন হবে। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন দেশে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে। তাঁর রক্তের বিনিময়ে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হয়। বাংলাদেশ এখন টেস্ট ক্রিকেটও খেলছে। কিন্তু তাঁর টেস্ট ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সেটা পূরণ না হলেও তিনি ক্রিকেটার ও গেরিলা যোদ্ধা হিসেবেই বেঁচে থাকবেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ যখন কোনো সাফল্য বয়ে আনে, তখন তাতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন শহীদ জুয়েল।    
আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েলকে মরণোত্তর ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৭ সালে তাঁকে ক্রিকেটে মরণোত্তর ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রতি বছর শহীদ জুয়েল একাদশ এবং শহীদ মুশতাক একাদশ-এর মধ্যে প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন এবং মিরপুর শের-এ-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তাঁর নামে একটি স্ট্যান্ডের নামকরণ করায়এখনও তাঁর নাম বিস্মৃত হয়নি। অবশ্য তাঁর নামটি কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। দেশের জন্য তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে। এই বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তিনিও তত দিন থাকবেন।                

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনালি অতীতের দিনগুলো / বশীর আহমেদ

স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা ‍আজ আর নেই-২

সোনালি অতীতের দিনগুলো-২ / বশীর আহমেদ

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্য এবং শঙ্করীপ্রসাদ বসু / দুলাল মাহমুদ

অন্তরঙ্গ আলাপনে উনিশ ব্যক্তিত্ব

শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত ফুল আর পরাধীনতা

শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত ফুল আর পরাধীনতা-২

স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা ‍আজ আর নেই

‘স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’ / দুলাল মাহমুদ

খন্দকার আবুল হাসান : একের ভেতর তিন/ দুলাল মাহমুদ