‘গুরুত্বহীন’ হয়ে যাওয়া সেই ম্যাচের কথা!
![]() |
হল্যান্ডের বিপক্ষে অসাধারণ ব্যাটিং করেন আকরাম খান। অপরাজিত থাকেন
৬৮ রানে
|
সেই দিনটিতে উদগ্রীব হয়ে ছিল পুরো বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশইবা বলি কেন, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের নাগরিকরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা নিয়ে অপেক্ষায় থেকেছেন। এ যেন অবজ্ঞা, অনাদর ও অমর্যাদা থেকে মুক্তির রুদ্রশ্বাস প্রতীক্ষা। এ ম্যাচের জয়ের সনদ পেলে অনেকটাই বদলে যাবে জীবনের আক্ষেপ, অপ্রাপ্তি ও মনস্তাপ। সঙ্গত কারণেই সেদিন থমকে যায় প্রতিদিনের জীবন। স্থবির হয়ে পড়ে চারপাশ। ইথারে ইথারে সরব হয়ে ওঠে অলি-গলি। জুম্বার নামাজে প্রার্থনার লক্ষ-কোটি হাতে একটিই আর্জি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কান্নাভেজা কণ্ঠে সবারই ছিল একটি প্রার্থনা। গ্লানি থেকে মুক্তি। ব্যর্থতা থেকে মুক্তি। অপারগতা থেকে মুক্তির আর্তি।
বছরের পর বছর স্বপ্নভঙ্গের যাতনা সইতে হয়েছে বাংলাদেশকে। বইতে হয়েছে অক্ষমতা ও ব্যর্থতার বেদনা। কেউ না কেউ বার বার স্বপ্নগুলো দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। যে কারণে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। আইসিসি ট্রফির একদম শুরুতে পথ আগলে দাঁড়ায় শ্রীলঙ্কা ও কানাডা। লঙ্কানরা খুব দ্রুত নিজেদের অবস্থান গড়ে নেওয়ার পর তাদের নিয়ে আর মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হয় নি। এরপর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ে। বেশিরভাগ সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আফ্রিকান এই দেশটি। জিম্বাবুয়ে এলিট ঘরানায় নাম লেখালে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে বাংলাদেশ। যাক, এখন আর কোনো বাধা রইলো না। কিন্তু ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কেনিয়া ও হল্যান্ড যখন আইসিসি ট্রফির কোটায় বিশ্বকাপ খেলে, তখন কেন যেন মনে হতে থাকে, এ জনমে বুঝি আর বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা হবে না। তবুও আশা ছাড়তে চায় না মন। সবাই পারলে ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন পারবো না?
১৯৯৭ সালে আকরাম খানের নেতৃত্বে ১৪ মার্চ মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন অভিযাত্রা। এ যাত্রা আমাদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তোলে। যদিও যাওয়ার আগে বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ গর্ডন গ্রীনিজ খেলোয়াড়দের উপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করতে সবার কাছে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাতে কি আর চিঁড়া ভেজে? সেবার আইসিসি ট্রফির সেরা তিনটি দেশের মধ্যে থাকতে পারলে খেলা যাবে স্বপ্নের বিশ্বকাপ। কত কত দিন এমন একটি স্বপ্ন লালন করে আসছে একটি জাতি। সেই স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশার চাপ তো থাকবেই।
সফরের শুরুতেই সূচক হিসেবে আসতে থাকে একের পর এক অশনিসঙ্কেত। যে দলগুলো আইসিসি ট্রফির প্রধান প্রতিপক্ষ সেই হল্যান্ড, কেনিয়ার কাছে প্রস্তুতি ম্যাচে সহজেই হার মানতে হয় বাংলাদেশকে। মনটা কেন যেন দমে যায়। তবে লড়াইয়ের মাঠে নামার পর প্রথম রাউন্ড পাড়ি দিতে বেগ পেতে হয় নি। প্রতিটি ম্যাচেই জয় আসে। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশের ম্যাচগুলোতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় প্রকৃতি। বৃষ্টিবিলাসী এ জাতির কাছে এটি যেন অভিশাপ হয়ে আসে। বৃষ্টির জন্য হংকং-এর সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগির পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যদিও বৃষ্টি বাগড়া দেওয়ার আগেই জয় তুলে নেওয়া সম্ভব হওয়ায় সূচনাটা ভালোই হয়।
![]() |
রানের
হিসেবে করছেন ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ও কোচ গর্ডন গ্রীনিজ
|
কিন্তু আইরিশরা যে ছলকলায় পারদর্শী, সেদিন সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায়। ৩ বল খেলার পর শুরু হয় তাদের অভিনয় কৌশল। আম্পায়ারদেরও মনে হতে থাকে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের চরিত্র শাইলকের মতো। আইরিশ খেলোয়াড়রা মাঠ অনুপযুক্ত দাবি করলে আম্পায়াররা সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে দেন। ন্যায্য বিচার পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবী বালথাজাররুপী পোর্শিয়া ছিলেন না। এ কারণে এত উদ্যোগ, এত প্রচেষ্টা, এত প্রত্যাশার পরও অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় বাংলাদেশকে। পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় মারাত্মক চাপে পড়ে যায়।
দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশকে যেভাবেই হোক হারাতে হবে হল্যান্ডকে। এটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ভাগ্যপরীক্ষার ম্যাচ। এ ম্যাচে জিতলেই কেবল সেমিফাইনাল খেলতে পারবে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ বেশ শক্তিশালী। ১৯৮২ সালের পর তাদের হারানোর রেকর্ড নেই বাংলাদেশের। দিন কয়েক আগে প্রস্তুতি ম্যাচেও তাদের কাছে হারতে হয়েছে। যাহোক, টস হেরে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ডাচরা তোলে ১৭১ রান। এই স্কোরকে খুব বড় কোনো চ্যালেঞ্জ মনে হয় নি। কিন্তু ১৫ রানেই টপঅর্ডারের চার ব্যাটসম্যান নাইমুর রহমান দুর্জয়, সানোয়ার হোসেন, আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আতাহার আলী খান একে একে ফিরে যাওয়ার কথা বেতারের ধারাবিবরণীতে শোনার পর বুকের মধ্যে এক একটি শেল হয়ে বিঁধছিল। দিনটি ছিল ৪ এপ্রিল। এ কারণেই কিনা টি এস এলিয়টের কবিতার লাইনটি মনের কোণে ভিড় জমায় : APRIL is the cruellest month. এটিও আশঙ্কার কারণ হয়ে ওঠে। এ ম্যাচে হেরে গেলে বিদায় হয়ে যাবে বাংলাদেশের। আবারও স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কায় আক্রান্ত হয় পুরো দেশ।
তবে বাংলাদেশ ১৮ দশমিক ৫ ওভারে ৫৬ রান করার পর আর্শিবাদ হয়ে আসে বৃষ্টি। সে সময় বৃষ্টিকে খুবই রোমান্টিক মনে হতে থাকে। মদন মোহন তর্কালঙ্কারের ছড়াটিকে মধুর মনে হয়, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে/ধান দিব মেপে/লেবুর পাতা করমচা/যা বৃষ্টি ঝরে যা।’ তখন খেলা শেষ হলে বাংলাদেশ জিতে যায়। তাই ময়ূরের মতো খুশিতে নেচে ওঠে হৃদয়। কিন্তু ২০ ওভার খেলা হলেই নির্ঘাত বিদায় নিতে হবে বাংলাদেশকে। সেক্ষেত্রে টার্গেট দাঁড়াতো ২০ ওভারে ৭৭ রান। আমাদের চাওয়া মতো তো আর সব কিছু হওয়ার নয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে তো সবাই সমান। প্রতিপক্ষরা নিশ্চয়ই তাঁর স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন। সে কারণেই কিনা এক ঘণ্টা পর থেমে যায় বৃষ্টি। সেই মুহূর্তে প্রকৃতিদেবতাকে আমাদের কাছে বড় নিষ্করুণ মনে হতে থাকে। ডাকওয়ার্থ-লুইস মেথডে ১৪ দশমিক ১ ওভারে অর্থাৎ ৮৫ বলে ৮৫ রানের কঠিন টার্গেট। অর্থাৎ মোট ৩৩ ওভারে ১৪১ রান। (সেদিন বোধকরি জানতে পারি ডাকওয়ার্থ-লুইস (ডিএল) মেথড-এর গুরুত্ব সম্পর্কে। ক্রমান্বয়ে শিখতে থাকি নতুন নতুন শব্দ। নতুন নতুন ব্যাখ্যা। নতুন নতুন বিশ্লেষণ। যদিও এ মেথড আজও হৃদয়ঙ্গম হয় নি।)
ভিজে আউটফিল্ড। সার্বক্ষণিক বৃষ্টির আশঙ্কা। সব মিলিয়ে আবারও যেন নিরাশার বালিতে মাথা কুটে মরার দশা। অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়ে বুকের মধ্যে হাহাকার নিয়ে বাজতে থাকে, ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর/ বেদনার বালুচরে/নিয়তি আমার ভাগ্য লয়ে যে/নিশি দিন খেলা করে/হায় গো হৃদয় তবুও তোমার/আশা কেন যায় না/যতটুকু যায় কিছু তার পায় না/কিছু তার পায় না/কে জানে কেন যে আমার আকাশ/মেঘে মেঘে শুধু ভরে।’ কিন্তু সেদিন একজন ছিলেন স্থির, অচঞ্চল ও অটল পাহাড়ের মতো অবিচল। কিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ করছিল না। তিনি যেন নিয়তির সঙ্গে তাঁর বিশালদেহী শরীরটা নিয়ে পাঞ্জা লড়াই করার জন্য ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সেটা আমরা কেউ বুঝতে পারি নি। তিনি হলেন আকরাম খান। আত্মবিশ্বাস, জেদ আর লড়াকু মনোভাব নিয়ে গ্ল্যাডিয়েটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। কখনই নতজানু হন নি। পঞ্চম উইকেটে মিনহাজুল আবেদিন নান্নুকে নিয়ে তিনি ৬২ রান যোগ করলে আশার আলো দেখা দেয়। কিন্তু নান্নু রান আউট এবং এর কিছুক্ষণ পর এনামুল হক মণি ফিরে গেলে ফের আশঙ্কার কালোমেঘে ছেয়ে যায় মনের আকাশ। তীরে এসে ডুববে নাতো তরি? তখনও প্রশস্ত বুক আর চওড়া ব্যাট দিয়ে দিয়ে একপাশ আগলে রাখেন অধিনায়ক। সপ্তম উইকেটে সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ৫০ রানের পার্টনারশিপ গড়লে তীরের কাছাকাছি পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বুক চিতিয়ে লড়াই করে দলকে জয় এনে দেন প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ আকরাম খান। ৬৮ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসটির জন্য বদলে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। ব্যক্তিগত একটি ইনিংস যে একটি জতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিল, সেদিন সেটা আমরা পলে পলে অনুভব করেছিলাম।
![]() |
জয়ের
আনন্দে উদ্ভাসিত বাংলাদেশ
|
![]() |
সেমিফাইনালে
হাবিবুল হোসেন শান্তর অব্যর্থ থ্রোতে রান আউট হয়ে শুন্য রানে ফিরে যান
স্কটল্যান্ডের্ ব্রিন লকি
|
![]() |
স্কটল্যান্ডের
বিপক্ষে প্রেয়ার অব দ্য ম্যাচ খালেদ মাসুদ পাইলট
|
১২ এপ্রিল আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়ার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। যদিও এ ম্যাচে জয়-পরাজয়ের কোনো গুরুত্ব ছিল না। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবের সঙ্গে কোনো তুলনা হয় না। আফ্রিকান এ দেশটি তখন হেলাফেলার দল ছিল না। স্টিভ টিকোলোর ১৪৭ রানের ইনিংসে উপর নির্ভর করে কেনিয়া নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে তোলে ২৪১ রান।
![]() |
ফাইনালে
মোহাম্মদ রফিকের বলে কেনিয়ান অধিনায়ক মরিস ওদুম্বেকে স্ট্যাম্পিং করছেন খালেদ মাসুদ
পাইলট
|
![]() |
চ্যাম্পিয়ন
হওয়ার পর অধিনায়ক আকরাম খানের নেতৃত্বে মাঠ প্রদক্ষিণ
|
বিকেলে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে মানিক মিয়া এভিনিউতে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয় গর্বিত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে। সেই গর্ব, সেই গৌরব বহন করছে আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট। মার্কিন কবি এলিয়ট এপ্রিলকে নিষ্ঠুর ও নির্দয় মাস হিসেবে অভিহিত করলেও বাংলাদেশে এ মাসে উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়, তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই এপ্রিলে পালাবদল ঘটে বাংলাদেশের। ক্রিকেট হয়ে ওঠে একটি জাতির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক। আর এর উৎসে ছিল ৪ এপ্রিল এবং আকরাম খান। এ দিনটির কথা কি কারো মনে পড়ে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন